যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে খুন হয়েছেন বাংলাদেশের রাইড শেয়ারিং অ্যাপ পাঠাও-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম সালেহ। খুন করে ইলেকট্রিক করাত দিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেছিলো ঘাতক। ইতিমধ্যেই খুনি সন্দেহে নিউইয়র্ক পুলিশ গ্রেফতার করেছে চুরির দায়ে চাকুরিচ্যুত করা ফাহিমের সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী টেরেস ডেভোন হাসপিলকে। চলছে তদন্ত। ফাহিম খুনের বিষয়টি নিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে ভারতে অবস্থানরত লেখিকা তসলিমা নাসরিন একটি বিশদ পোস্ট করেছেন ফেসবুকে, যাতে তিনি আঙ্গুল তুলেছেন বেশ কিছু বিষয়ের দিকে। পাঠকদের জন্য তসলিমা নাসরিনের লিখাটি হুবহু তুলে ধরা হল-

“নিউইয়র্ক শহরে অর্থাৎ ম্যানহাটনে আমি একসময় বাস করেছি। তখন নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে আমি একটা ফেলোশিপ করছিলাম। ইউনিভার্সিটির কাছাকাছি কোথাও আমাকে থাকতেই হত। আমার অ্যাপার্টমেন্ট ছিল ওয়াল স্ট্রিটের সঙ্গেই, ওয়াশিংটন স্ট্রিটে। যে স্ট্রিটের ওপরই ছিল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার।

এলাকাটাকে ডাউনটাউন বলে, যেটা হাডসন নদীর পাড়েই। আবাসিক এলাকা হিসেবে মোটেও জনপ্রিয় নয়। তাই শহরের অন্যান্য ভালো আবাসিক এলাকার চেয়ে ভাড়াও বেশ কম ছিল। ইয়ুপ্পিদের বসবাসের জন্যই মূলত বিল্ডিংগুলো তৈরি। YUPpie মানে ইয়ং আরবান প্রফেশনাল।

২৩ তলায় আমার অ্যাপার্টমেন্ট ছিল ছোট একখানা স্টুডিও, কিন্তু ওতেই আমি খুশি ছিলাম, কারণ অ্যাপার্টমেন্ট থেকে দেখা যেত হাডসন আর ইস্ট রিভার, দেখা যেত এলিস আইল্যাণ্ড। আর মাথা খুব কাত করলে লিবার্টি স্ট্যাচু। বিল্ডিংটায় ছিল ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা রক্ষী।

অচেনা সবাইকে গ্রাউণ্ড ফ্লোরে বসা নিরাপত্তা রক্ষীরা থামাত, কোথায় কোন ফ্লোরে কার কাছে যাবে জিজ্ঞেস করা হত, যার কাছে যাবে তাকে রক্ষীরা জানাত, সে যদি অনুমতি দিত, তবেই আগন্তুক তার কাছে যেতে পারত। আগন্তুককে অবশ্য নিরাপত্তা রক্ষীদের খাতায় লিখে আসতে হত সব, নিজের নাম ঠিকানা ফোন নম্বর সই — কটার সময় এলো — সব।

আমাদের ওই সাধারণ মানের বিল্ডিংয়েই যদি নিরাপত্তার ব্যাপারে এত কড়াকড়ি, তাহলে ধনীদের এলাকায়, যেখানে মিলিওনিয়ার বিলিওনিয়াররা বাস করে, সেখানে কী অবস্থা। আপার ইস্ট সাইডের লাক্সারি অ্যাপার্টমেন্টে এক পরিচিত মহিলার সঙ্গে কয়েক বছর আগে দেখা করতে গিয়েছিলাম। ওরে বাপরে, মাথা থেকে পা পর্যন্ত স্ক্যান করে তারপর ভেতরে ঢুকতে দিল। অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকছি না তো যেন ফ্লাই করার জন্য অ্যারোপ্লেনে ঢুকছি।

আজ সকালে ফাহিম সালেহর হত্যাকাণ্ডের খবর শুনে প্রথমেই যে প্রশ্নটি মাথায় এল, তা হলো খুনী কী করে ঢুকলো ওই বিল্ডিংয়ে। সিকিউরিটির লোকেরা কোথায় ছিল? ফাহিমের অ্যাপার্টমেন্ট ছিল ২.২৫ মিলিয়ন ডলার দিয়ে কেনা। প্রচণ্ড ধনী লোকদের বাস বিল্ডিংয়ে। ধনীরা নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন।

তাই বলছি, কালো পোশাকে আবৃত খুনীটি যে কোনো অ্যাপার্টমেন্টে বাস করে না, তা তো সিকিউরিটির লোকেরা জানতো, তাহলে থামায়নি কেন? খুনীটি টুকরো টুকরো করে কেটেছে ফাহিমকে। ইলেক্ট্রিক করাত নিয়ে গিয়েছিল কাটার উদ্দেশেই। মাথা, পা, হাত প্লাস্টিকের ব্যাগেও ভরেছে। টুকরোগুলো কি সে যাবার সময় নিয়ে যেতে চেয়েছিল? কিন্তু নেবেই বা কেন? পাশের অ্যাপার্টমেন্টের লোকেরা ফাহিমের আর্তচিৎকার শুনেছে, কিন্তু পুলিশে কল করেনি। এও খুব বিজার।

মাত্র ৩৩ বছর বয়সী উদ্যমী পরিশ্রমী স্বপ্নবান যুবকটিকে কারা মেরেছে, আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে। হত্যার পেছনে, পুলিশ জানিয়েছে, সম্ভবত অর্থকড়ির বিষয় জড়িত ছিল। অল্প বয়সেই প্রচুর কাজ করেছেন, নতুন নতুন আইডিয়ার জন্ম দিয়েছেন, নতুন নতুন অ্যাপ বানিয়েছেন, বিভিন্ন দেশে নতুন নতুন কোম্পানি গড়েছেন ফাহিম।
নাইজেরিয়ার শহরে ভিড়ের রাস্তায় পাবলিক ট্রান্সপোর্টের জন্য অপেক্ষা করা ক্লান্ত মানুষকে ফাহিমের তৈরি গোকাডা কোম্পানি রাইড দেয়, বাংলাদেশে তার পাঠাও কোম্পানি একই কাজ করে, মানুষকে বাইকে রাইড দেয়। মানুষের সময় বাঁচে। মানুষ স্বস্তি পায়। এরকমই তো জানি। তাহলে কে বা কারা হিট্ম্যান পাঠাবে ওকে কেটে টুকরো করার জন্য? ভালো কাজ করা মানুষের এত বড় শত্রু কি থাকে? নিশ্চয়ই থাকে। আমারই তো আছে।

মানুষের ভালোর জন্য চল্লিশ বছর ধরে লিখছি, আমাকে পেলে তো ধর্মান্ধরা ওভাবেই টুকরো টুকরো করে কাটবে।মানুষের মতো ভালো প্রাণী জগতে কেউ হয় না, মানুষের মতো নৃশংসও কেউ হয় না।”

আরও পড়ুন-