দুর্যোগে মানুষ চেনা যায়, আয়নায় ভেসে উঠে মানুষের প্রকৃত রূপ। বাবার লাশ ফেলে সন্তানের পালিয়ে যাওয়া কিংবা করোনা সন্দেহে মা’কে রাস্তার ধারে ফেলে যাওয়া- মহামারি করোনাভাইরাস আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেছে রূঢ় বাস্তবতা, পরীক্ষা নিয়ে নিচ্ছে মানবিকতার। এর মাঝেও অনেকে আলোকবর্তিকা হয়ে উঠেছেন, আশার আলো দেখাচ্ছেন মানবিক গল্পের জন্ম দিয়ে। তানভীর হাসান সৈকত আলোকবর্তিকা হয়ে আসা সেসব মানুষদের মাঝে উজ্জ্বলতম একজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি অংশে গত অর্ধশতকের বেশী দিন ধরেই মানবিক গল্প বুনে চলছেন সৈকত, এই তরুণ প্রতিদিন আহার জুগিয়ে যাচ্ছেন প্রায় হাজার খানেক মানুষের। শুরুর দিকে পরিমাণ খানিকটা কম ছিলো, ক্রমেই বেড়েছে সে পরিমাণ। রমজানে ইফতার ও সেহরিতে টিএসসিতে গেলেই শহরের অসহায় দিনমজুর, ছিন্নমূল ও ভাসমান মানুষের জন্য মিলছে দুবেলা দুমুঠো খাবার।

লক্ষীপুরের সন্তান তানভীর, পড়ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগে। ২৮ বছর পর হওয়া ডাকসু নির্বাচনে সদস্য পদে নির্বাচিত হয়ে সোচ্চার থেকছেন গণরুম প্রথা উচ্ছেদ, হল ক্যান্টিনের খাবারের মান বাড়ানো নিয়ে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সদস্য ছিলেন, এখনো ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন আগের মতোই।

করোনায় ছিন্নমূল মানুষের খাদ্য সংকটের কথা চিন্তা করে খাবার জোগানের শুরুটা ছিল ২৩ মার্চ ২০২০, এর মধ্যে কেটে গেছে ৫১ দিন! স্বাভাবিক ভাবেই মনে প্রশ্ন জন্মাতে পারে, লম্বা সময় ধরে কিভাবে করছেন এমন অসাধ্য সাধন? সাদামাটা ভাবেই সৈকতের উত্তর, “যদি শুধু দায়িত্বের জায়গা থেকে কাজটি করতে হতো তাহলে হয়তো আমি পারতাম না। বরং দায়িত্বের সাথে এই মানুষগুলোর প্রতি ভালোবাসা আছে বলেই কাজটি করতে পারছি।”

কিভাবে চলছে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ জানতে চাইলে সৈকত জানান, “ব্যক্তি উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণের পর ছিন্নমূল মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসতে আহ্বান জানিয়ে ফেসবুকে স্টাটাস দিয়ে সাহায্য চেয়ছি। এরপর থেকে সবাই এগিয়ে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বন্ধু-বান্ধব, সাংবাদিক, ব্যাংকার ও পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তাও সৈকতকে অর্থ সহায়তা করেছেন। এখন আমরা অন্তত ১০ জনের মতো মানুষ একত্রিত হয়ে কাজ করছি। রাতের বেলা কারওয়ান বাজার থেকে খাবার কিনে আনা হয়। দুপুরে শুরু হয় ইফতারি তৈরির প্রস্তুতি, আর রাতে রান্না করা হয় সেহরির খাবার।”

ইতিমধ্যেই সৈকতের এমন মানবিক কাজের খবর পৌঁছে গেছে কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের কাছে, কিছুদিন আগে তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়েদুল কাদের। অনুদানের পাশাপাশি অনুপ্রেরণা দেয়ার কথা সৈকত নিজেই জানিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

লকডাউনের শুরুতে যে মানুষগুলোর কথা ভেবে বাড়ি যাননি সৈকত, যাদের জন্য টিএসসির গেস্টরুমকে বানিয়েছেন শোবার ঘর- অর্ধশকত দিনে সেই ছিন্নমূল মানুষগুলো হয়ে উঠেছে তাঁর পরিবারের সদস্যদের মতো। মানুষগুলোর মায়ায় পড়ে চালিয়ে যাচ্ছেন কাজটি। এমনকি এই ছিন্নমূল মানুষদের কেউ অসুস্থ্য হলে ছুটে যাচ্ছেন সৈকত ও তাঁর বন্ধুরা। ডাক্তার ডেকে তাপমাত্রা দেখে কিনে দিচ্ছেন ওষুধও।

তাইতো করোনার সাথে চলমান এই যুদ্ধে সৈকতদের চোখেই স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ, সৈকতরাই মানবিক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। খুব করে চাই- এমন উদার মানবিকতার কাছে হেরে যাক করোনা, জিতে যাক বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন-