প্রবাসী বাংলাদেশী

মালয়েশিয়ায় বসবাসরত অভিবাসীদের প্রতি লকডাউন চলাকালে দেশটির সরকারের নিপীড়নমূলক আচরণ উঠে এসেছে আল জাজিরায়। রায়হান কবির নামের এক প্রবাসী বাংলাদেশি এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে সাক্ষাতকার দেন। এখন তাকেও খুঁজছে মালয়েশিয়ার পুলিশ। অথচ রায়হান কোন অপরাধ করেনি।

ছবিগুলো দেখুন। কুয়ালালমপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের। হাতে শিকল বেঁধে আমার চোখের সামনে গরু-ছাগলের মতো টেনে নেওয়া হচ্ছিল এই বাংলাদেশিদের ঢাকায় পাঠানোর জন্য। আমার নিজের তোলা এসব ছবি ও ভিডিও প্রথমবারের মতো দিলাম ফেসবুকে। দেওয়ার কারণ আল জাজিরা টেলিভিশনে প্রচারিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নিয়ে নিয়ে তোলপাড় চলছে মালয়েশিয়ায়।

লকড আপ ইন মালয়েশিয়ান লকডাউন-১০১ ইস্ট-শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে মালয়েশিয়ায় বসবাসরত অভিবাসীদের প্রতি লকডাউন চলাকালে দেশটির সরকারের নিপীড়নমূলক আচরণ উঠে এসেছে। রায়হান কবির নামের এক প্রবাসী বাংলাদেশি এই নিপীড়নের বিরুদে প্রতিবাদ করে সাক্ষাতকার দেন। এখন তাকেও খুঁজছে পুলিশ। অথচ রায়হান কোন অপরাধ করেনি।

আল জাজিরার এই প্রতিবেদনে অভিবাসীদের প্রতি মালয়েশিয়ার নিপীড়েনের যে ছবি উঠে এসেছে সেটা তো কোন সভ্যতার ছবি নয়। সেখানে দেখা হয়েছে কর্মহীন ও খাদ্য সংকটে থাকা অভিবাসী শ্রমিকদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করে তাদের বসতঘর থেকে গরু-ছাগলের মতো টেনে ডিটেনশন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

সাংবাদিক হিসেবে মালয়েশিয়া প্রবাসীদের দুরবস্থার নিয়ে গতে একযুগে অনেক কাজ করতে হয়েছে। এশিয়ার অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ মালয়েশিয়া। রাস্তার দুই পাশে আকাশছোঁয়া সব অট্টালিকা, অসংখ্য ফ্লাইওভার, প্রশস্ত সব সড়ক দেখে মুগ্ধ হতে হয়। কিন্তু এমন একটি দেশে অধিকাংশ বাংলাদেশি শ্রমিকদের দাসের মতো জীবন কাটাতে হয়। যতোবার মালয়েশিয়ায় কাজ করতে গিয়েছে সবসময় শুনতে হয়েছে বিপুল পরিমান লোকের কাগেজপত্র ঠিক নেই। এর একটা বড় কারণ নিয়োগকর্তারা সেগুলো যথাসময়ে করেন না। আবার অনেকে মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরে থাকেন। ফলে এই বাংলাদেশিদের সবসময় পুলিশের ভয়ে থাকতে হয়। ভয়ে বাড়ি থেকে লাফ দিয়ে অনেকের হাত-পাও ভেঙেছে।

মালয়েশিয়া প্রবাসীদের কাছে ভয়াবহ আতঙ্কের নাম রতান (বেত মারা)। ভয়ে গা শিউরে ওঠে রতানের বর্ণনা শুনে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ‘এ ব্লো টু হিউম্যানিটি: টর্চার বাই জুডিশিয়াল ক্যানিং ইন মালয়েশিয়া’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে বলেছে, ক্যাম্প বা কারাগারে ৫০ থেকে ৬০ জনকে একসঙ্গে রেখে মধ্যযুগীয় কায়দার বেত মারা হয়। চার ফুট লম্বা ও এক ইঞ্চি মোটা এই বেতের প্রচণ্ড এক আঘাতেই অধিকাংশ মানুষ অজ্ঞান হয়ে যান। শরীরের চামড়া কেটে যায়, রক্ত জমাট বেঁধে যায়। জ্ঞান ফেরে ১২ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর। অসংখ্য বাংলাদেশি এই নির্যাতনের শিকার।

অভিবাসীদের কীভাবে অসম্মান করা হয় আল জাজিরার প্রতিবেদনে সেটি দেখানো হয়েছে। এই যে গরু-ছাগলের মতো লোকজনকে টেনে নেওয়া সেটা কিন্তু নতুন নয়। ২০১৫ সালে আমার চোখের সামনেই এই ঘটনা ঘটেছে। মনে আছে, দেশে পাঠানোর জন্য কুয়ালালামপুরের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনের ফুটপাতে ৯৪ বাংলাদেশিকে খালি পায়ে গেঞ্জি পরিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছিল ঢাকা পাঠানোর জন্য। তাদের সবার হাতে ছিল শিকল।

প্রবাসী বাংলাদেশী
প্রবাসী বাংলাদেশীদের হাতে শিকল বেঁধে এমনভাবে নেওয়া হচ্ছে যেন তারা গরু ছাগল।

পরপর দুদিন বমেন ঘটনা দেখি। শুধু ফুটপাতে নয়, পরদিন গেঞ্জি-লুঙ্গি পরা মানুষগুলোকে দেখি খালি পায়ে। হাতে শিকল বেঁধে এমনভাবে নেওয়া হচ্ছে যেন তারা গরু ছাগল। বিমানবন্দরে নানা দেশের মানুষ সেদিন বিস্ময় নিয়ে এই বাংলাদেশিদের দেখছিলেন।

অভিবাসনের কোন আইনেই এভাবে শিকল পরানোর এই নিয়ম নেই। কিন্তু বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা এ নিয়ে কোন কথা বলেননি। ছবি ও প্রতিবেদন প্রকাশের পর মালয়েশিয়া বিমানবন্দরে শিকল পরানো বন্ধ করে।

মালয়েশিয়ায় থাকা যে কোন বোধসম্পন্ন বাংলাদেশি এসবের প্রতিবাদ করবে। রায়হান কবির আল জাজিরায় সেভাবেই প্রতিবাদ করেছিলেন। কিন্তু এখন তাকে খোঁজার জন্য মালয়েশিয়া উঠে পড়ে লেগেছে। আল জাজিরা থেকে ছবি নিয়ে মালয়েশিয়ার গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে পুলিশ বলছে, তাঁর খোঁজ দিতে। তাকে পেলে যে কোন সময় গ্রেপ্তার করা হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

রায়হান কবির তো কোন অপরাধ করেননি। তিনি আল জাজিরায় শুধুমাত্র সাক্ষাতকার দিয়েছেন। সেই সাক্ষাতকারে তিনি যা দেখেছেন সেটাই বলেছেন। তাহলে তাকে কেন গ্রেপ্তার করা হবে? কেন দাগী আসামির মতো ছবি প্রকাশ করে তাকে খুঁজতে হবে। এটা পুরো বাংলাদেশের অপমান। মালয়েশিয়ার অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ঘটনার প্রতিবাদ করছেন। আমার মনে হয় শুধু সাধারণ প্রবাসী নয়, মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস, ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ পুরো বাংলাদেশের রায়হানের পাশে থাকা উচিত।

লিখেছেন- শরীফুল হাসান, ব্র্যাক কর্মকর্তা।

আরও পড়ুন-