ডা. সাবরিনা

‘সুমন, আমি জেকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা বলছি। তুমি খুব কিউট। আমার প্রতিনিধি পাঠাচ্ছি। করোনা নমুনা সংগ্রহ করতে সব ধরনের সহযোগিতা কর।’- এমন ম্যাসেজ পাঠাতেন বলে জানিয়েছেন উপকমিশনার (ডিসি) হারুন অর রশিদ। রিমান্ডের প্রথম দিন উঠে এসেছে এমন আরও তথ্য।

সরকারের কাছ থেতে বিনা মূল্যে নমুনা সংগ্রহের অনুমতি নিয়ে বুকিং বিডি ও হেলথকেয়ার নামে দুটি সাইটের মাধ্যমে টাকা নেওয়া এবং নমুনা পরীক্ষা ছাড়াই ভুয়া সনদ জালিয়াতি করার অভিযোগে গ্রেপ্তার জেকেজি হেলথকেয়ারের চেয়ারম্যান ও জাতীয়  হৃদেরাগ ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ডা. সাবরিনা চৌধুরীর মোবাইল ফোন চেক করে এ ধরনের অনেক মেসেজ পেয়েছে পুলিশ। প্রতিটি মেসেজের শুরুতেই সাবরিনা নিজেকে জেকেজির চেয়ারম্যান দাবি করেন বলে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদকারী ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হারুন অর রশিদ জানিয়েছেন।

হারুন অর রশিদ গতকাল জানান, তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে সাবরিনাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়েছে। এরই মধ্যে তিনি কিভাবে প্রতারণার ফাঁদ পেতে করোনা নমুনা পরীক্ষা ছাড়াই ভুয়া সনদ দিতেন সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন।

জেকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনাকে গতকাল সোমবার সকালে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে চার দিনের রিমান্ডের আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম শাহিনুর রহমান তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

জাতীয় হৃদেরাগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের রেজিস্টারের দায়িত্ব পালন করে আসা ডা. সাবরিনা জেকেজি হেলথকেয়ারের প্রধান নির্বাহী আরিফুল হক চৌধুরীর স্ত্রী। সে কারণে সাবরিনা আরিফ চৌধুরী নামেই তিনি পরিচিত। করোনাভাইরাস পরীক্ষা নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগে এক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে সাবরিনার স্বামী আরিফুল বর্তমানে কারাগারে।

জানতে চাইলে ডিসি হারুন অর রশিদ গতকাল বলেন, অতি সম্প্রতি জেকেজির ব্যাপারে বিশদ তদন্ত করতে গিয়েই উঠে আসে ডা. সাবরিনা ও তাঁর প্রতারক স্বামী আরিফ চৌধুরীর নাম। এরপর গত রবিবার ডা. সাবরিনাকে  হৃদেরাগ হাসপাতাল থেকে তাঁর কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর তেজগাঁও থানার এক মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

তিনি বলেন, জেকেজির কোনো ট্রেড লাইসেন্স নেই। এরপরও কিভাবে প্রতিষ্ঠানটি করোনা নমুনা সংগ্রহের অনুমতি পেল তার তদন্ত চলছে। সাবরিনার মোবাইল ফোন চেক করে সাতটি মেসেজ পাওয়া গেছে। প্রতিটি মেসেজে সাবরিনা বিভিন্ন মানুষকে ফোন করে কখনো জেকেজির চেয়ারম্যান, কখনো সমন্বয়ক আবার কখনো আহ্বায়ক পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করেছেন। তাঁকে সহযোগিতাকারী অনেক প্রভাবশালীর নাম জানা গেছে।

সাবরিনার প্রতারণার শেষ নেই জানিয়ে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে তিনি এক রোগীর নামে নিবন্ধিত মোবাইল সিম ব্যবহার করে সেটি প্রতারণার কাজে ব্যবহার করে আসছিলেন। রিমান্ডে জানতে চাইলে সাবরিনার দাবি, ওই সিম কার নামে নিবন্ধিত তা তিনি জানতেন না। তবে পুলিশ বলছে, অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করা বড় ধরনের অপরাধ। কারণ এই সিম ব্যবহার করে বড় ধরনের অপরাধ করে তার দায় অন্যের ওপর চাপানো যায়। বিষয়টি যাচাই করতে সাবরিনার গাড়ির চালককে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ জানতে পেরেছে, প্রায় এক বছর ধরে সাবরিনা এই সিম ব্যবহার করছেন। জালিয়াতির মামলায় গ্রেপ্তার আরিফুলের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে রিমান্ডে সাবরিনা দাবি করেন, দুই মাস আগে তাঁদের তালাক হয়ে গেছে।

তেজগাঁও থানা সূত্র জানিয়েছে, জেকেজির বিরুদ্ধে মোট চারটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি প্রতারণার এবং আরেকটি থানায় হামলা, ভাঙচুর ও পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে করা হয়েছে। প্রথম মামলাটি দায়ের করেন কামাল হোসেন নামে এক ভুক্তভোগী। সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা আত্মসাৎ, করোনাভাইরাস পরীক্ষার ভুয়া প্রতিবেদন দেওয়া ও জীবন বিপন্নকারী রোগের সংক্রমণের মধ্যে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ আনা হয় এজাহারে। ওই মামলায় গত ২৩ জুন আরিফুলকে গ্রেপ্তারের পর জেকেজি কর্মীরা তেজগাঁও থানায় গিয়ে বিক্ষোভ করে। পরে পুলিশ বাদী হয়ে আরেকটি মামলা করে এবং তাতে জেকেজির ১৮ কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আরিফের গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে দুজন ব্যবসায়ী একই থানায় আরো দুটি মামলা করেন। এর একটিতে ১২টি ল্যাপটপ ভাড়া নেওয়ার নামে আত্মসাৎ করা এবং অন্যটিতে দুটি আর্চওয়ে এবং ২০টি ওয়াকিটকি কিনে টাকা না দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে আরিফকে তিনটি প্রতারণার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আর সাবরিনাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে প্রথম মামলায়। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেলে  প্রতারণার বাকি দুই মামলায়ও তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। এর আগে রাজধানীর কল্যাণপুরের একটি বাড়ির তত্ত্বাবধায়কের অভিযোগের সত্যতা পেয়ে গত ২২ জুন জেকেজি হেলথকেয়ারের সাবেক গ্রাফিক্স ডিজাইনার হুমায়ন কবির হিরু ও তাঁর স্ত্রী তানজীন পাটোয়ারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে প্রতিষ্ঠানটির সিইও আরিফুলকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মামলার বাদী কামালের অভিযোগ, তাঁর বাড়ির মালিক ও স্ত্রীর জ্বর, সর্দি হওয়ায় কভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য অনলাইনের মাধ্যমে জেকেজির পক্ষে হুমায়ুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাঁরা দুজন ছাড়াও তাঁদের ছেলে, গাড়িচালক, গৃহপরিচারিকার নমুনা তিন দফায় বিজয় সরনি মোড়ে হুমায়ুনের  লোক এসে নিয়ে যায়। এ জন্য ৪৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়।

গ্রেপ্তারের দিনই জাতীয় হৃদেরাগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল থেকে ডা. সাবরিনাকে বরখাস্ত করার অফিস আদেশ জারি করা হয়। এর ঘণ্টাখানেক পর সরকারি কর্মচারী বিধিমালা ভঙ্গের অভিযোগে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করার কথা জানায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ওই আদেশে বলা হয়, ডা. সাবরিনা শারমিন হুসাইন সরকারি চাকরিতে কর্মরত থাকা অবস্থায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জেকেজির চেয়ারম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি করোনা টেস্টের ভুয়া রিপোর্ট দেওয়া এবং অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর নমুনা পরীক্ষার জন্য  জেকেজিকে দায়িত্ব দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তখন এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে ডা. সাবরিনার কথাই বলা হতো। কিন্তু জুনের শেষ দিকে জেকেজির দুর্নীতির খবর প্রকাশ পাওয়ার পর সাবরিনা দাবি করেন, এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গত দুই মাস ধরে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই।

পুলিশ জানায়, জেকেজি হেলথকেয়ার থেকে এখন পর্যন্ত ২৭ হাজার রোগীকে করোনাভাইরাস পরীক্ষার প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১১ হাজার ৫৪০ জনের নমুনা আইইডিসিআরের মাধ্যমে পরীক্ষা করানো হয়েছিল। বাকি ১৫ হাজার ৪৬০টি প্রতিবেদন তৈরি করা হয় জেকেজি কর্মীদের ল্যাপটপে।  

আরও পড়ুন-