তরুণ

মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসে দিশেহারা সব শ্রেনী-পেশার মানুষ। চাকরি হারিয়েছে বেকার হয়ে বহু মানুষ, স্বপ্নের ঘর ভ্যানে তুলে রাজধানী ছাড়ার দৃশ্যে মন ভারী হয়েছে সকলের। এমন হতাশ ও মন খারাপের সময়ে আশার সূর্য উঁকি দিচ্ছে চার তরুণের কাছে, টানা লকডাউনে রূপালী ইলিশে স্বপ্ন দেখছে তাঁরা। তাদেরকে আয়ের পথ দেখিয়েছে ইলিশ।

রাসেল খান নিলয়, ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ছেন ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। পাশাপাশা চাকুরিও করছিলেন প্রাইভেট ফার্মে, কিন্তু করোনায় অফিস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ফিরে এসেছেন গ্রামে। চাকরি না হারালেও বেতন পাচ্ছিলেন না। খানিকটা হতাশ নিলয়ের মাথায় ভাবনা আসে, চাঁদপুরের তাজা ইলিশ নিয়ে ব্যবসার। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী দেশের যেকোন প্রান্তে গ্রাহকের ঘরে পৌঁছে দিবেন ইলিশ মাছ। বাড়ি চাঁদপুর হওয়া ইলিশের আড়ৎ চেনা ছিলো আগে থেকেই, আর ব্যবসার প্রচার করছেন ফেসবুক গ্রুপ ‘উই’তে (উইমেন এন্ড ই-কমার্স ফোরাম)। সাড়াও পেয়েছেন প্রচুর। ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম থেকে শুরু করে চেনা-অচেনা অনেককেই ইলিশ মাছ পাঠিয়েছেন নিলয়। চালু করেছেন ‘বেস্ট বাজার২৪’ নামের অনলাইন ব্যবসা।

রাসেল খান নিলয়
তরুণ উদ্যোক্তা রাসেল খান নিলয়।

ইলিশ নিয়ে ব্যবসার চিন্তা সম্পর্কে তরুণ এই উদ্যোক্তা জানালেন, “করোনাভাইরাসের কারনে মার্চের শেষ সপ্তাহে অফিস বন্ধ হয়ে যায়। বাসায় বেকার বসে না থেকে চাঁদপুরের ছেলে হিসেবে ইলিশ বিক্রির সিদ্ধান্ত নেই। অনলাইনে নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে পোস্ট দিয়ে প্রথমে অল্প-স্বল্প সাড়া পেতাম। কিন্তু ফেসবুক গ্রুপ উই’তে পোস্ট দেয়ার পর এখন নিয়মিত অর্ডার আসছে, প্রতিদিনই সারাদেশে প্রায় ২০ কেজি ইলিশ সরবরাহ দিচ্ছি। আড়ৎদারের কাছ থেকে পাইকারি দরে কিনে ভোক্তার কাছে তা অল্প কিছু টাকা বাড়তি দামে বিক্রি করে কিছু টাকা আয় থাকছে।”

ইলিশ নিয়ে কাজ করা আরেক তরুণ নিক্কন হাওলাদারের বাড়িও চাঁদপুর। মেঘনা নদী আর নাদী থেকে ধরে আনা ইলিশ মাছ দেখে বড় হওয়া নিক্কন ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করেছেন একটি সরকারী পলিটেকনিক থেকে। পড়াশুনা শেষে চাকুরী খুঁজে পাচ্ছিলেন না। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হবেন, কিন্তু করোনা বন্ধ করে দিয়েছে সে পথ। ক্যাম্পাসের সিনিয়র সোহানের কাছ থেকে পেলেন ইলিশ নিয়ে কাজ করার পরামর্শ। ব্যস, নেমে গেলেন। চাঁদপুর সদরেই বাড়ি হওয়ায় সুবিধা হলো বেশ। সাথে অফুরন্ত অবসর ও গ্রাহকের চাঁদপুরের ইলিশের স্বাদের প্রতি বাড়তি কদর থাকায় কাজটা সহজ হয়ে গেলো। রাসেল খান নিলয়ের মতো নিক্কনও ফেসবুক দিয়েই শুরু। নিজের টাইমলাইন ও উই- গ্রুপ দিয়ে পাচ্ছেন গ্রাহক। চালু করেছেন ‘ইলিশের বাজার’ নামে ফেসবুক পেজও।

নিক্কন হাওলাদার
তরুণ উদ্যোক্তা নিক্কন হাওলাদার।

নিক্কন জানালেন, “আসলে এ বয়সে বাসা থেকে টাকা চাইতে খুব লজ্জা লাগে, নিজেকে অনেক ছোট মনে হয়। অন্যদিকে চাকুরীও হচ্ছিলো না। করোনাকালীন এই সময়ে সোহান ভাই ইলিশ নিয়ে ব্যবসার আইডিয়া দিলো, নেমে গেলাম। মাছের রাজা ইলিশ আর ইলিশের রাজত্ব চাঁদপুর। দেশের অনেক জেলায় পাওয়া গেলেও চাঁদপুরের ইলিশ স্বাদ ও ঘ্রাণে অনন্য, তাই সারাদেশে চাহিদাও প্রচুর। কিন্তু চাঁদপুরের ইলিশ কিনা এই নিশ্চয়তাও ক্রেতারা প্রত্যাশা করেন। আমি যেহেতু চাঁদপুরের তাই বিশ্বাসের জায়গাটা অর্জন করা সহজ হয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে এক মনের বেশী ইলিশ সারাদেশে ডেলিভারি দিচ্ছি। স্বপ্ন দেখি একদিন বাংলাদেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও পৌঁছে যাবে চাঁদপুরের ইলিশের স্বাদ।”

ইলিশ নিয়ে কাজ করা অন্য দুজনের নাম একটি, অনিক। একজন অনিক রায়, আরেকজন অনিক মজুমদার। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করেছেন দুজনেই, গলা গলায় বন্ধুত্বটা সেই ষষ্ঠ শ্রেণী থেকেই। অনিক রায় পড়েছেন ব্যাংকিং এন্ড ইন্সুরেন্স নিয়ে, আর অনিক মজুমদার মানব সম্পদ উন্নয়ন বিভাগে। দুজনেই এখন এমবিএ’র ছাত্র। বন্ধুত্বের মতো চাওয়া-পাওয়ায়ও দুজনের ভীষণ মিল। চাকরীর চেয়ে উদ্যোক্তা হয়ে কিছু করাটাই বেশী টেনেছে দুজনকে। চট্টগ্রামে ‘লাঞ্চ লাগবে’- নামের ক্যাটারিং সার্ভিস চালু করেছিলেন তারা। এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম শহরের সকল কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান গুলোতে দুপুরের খাবার সরবহার করতো, কিন্তু করোনায় অফিস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বন্ধ সেটি। এখন শুরু করেছেন ইলিশ মাছের হোম ডেলিভারির ব্যবসা। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী আড়ৎ থেকে ইলিশ কিনে সেটিকে দ্রতু বাসায় পৌঁছে দিচ্ছেন তারা। চালু করেছেন ‘টাটকা ইলিশ’ নামে ফেসবুক পেজ।

অনিক রায় ও অনিক মজুমদার
স্কুল বেলার দুই বন্ধু অনিক রায় ও অনিক মজুমদার।

করোনায় বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যবসা থেকে নতুন কিছু শুরু করার বিষয়ে অনিক রায় জানালেন, “লাঞ্চ লাগবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা খুব হতাশ হয়ে পড়ি। করোনার কারণে টিউশনও বন্ধ। আয়ের সব পথ যখন বন্ধ, তখন হঠাৎ আমাদের মাথায় ইলিশ নিয়ে ব্যবসার বিষয়টি আসে। করোনায় মানুষ সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বাজার থেকে মাছ কেনাটা কঠিন কাজ, এছাড়া বাজারে আসা ইলিশ মাছগুলো অনেক সময় ৪/৫ মাস আগের বরফ দেওয়া থাকে, তাতে করে ইলিশের প্রকৃত স্বাদটা পাওয়া যায় না। আর মাছে ফরমালিনের ব্যবহার নিয়ে শংকা তো আছেই। এসব বিষয়গুলো চিন্তা করে ইলিশ নিয়ে কাজ করার আগ্রহটা বাড়ে। আমরা এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যেই চট্টগাম শহরের যেকোন বাসায় ইলিশ পৌঁছে দিচ্ছি, এবং কোন ডেলিভারি চার্জ ছাড়াই। এতে করে মানুষের খুব ভালো সাড়া পাচ্ছি, গড়ে আমাদের এখন ২৫-৩০ কেজি মাছ বিক্রি হচ্ছে।”

করোনা স্থবির করে দিয়েছে দেশের অর্থনীতি, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রোজগার ভাবনা। এমন দুর্ভাবনায় স্বাভাবিক হতাশা চারপাশে। তবে এর মাঝেও উঠতি তারুণ্যের এমন উদ্যমী চিন্তায় আমরা এই আশায় বুক বাঁধতেই পারি- অদৃশ্য এই শক্তির সাথে চলমান যুদ্ধে জয়ী হবে উদ্যমী তারুণ্য, জয়ী হবে বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন-