চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার গাজীপুর বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ডাকাতিয়া নদীর শাখা- এপাড়ের গাজীপুরের সাথে ওপাড়ের ধানুয়া গ্রামের বিভক্তি ছিলো একটি নদী। দুপাড়ের মানুষের যোগাযোগের প্রধান বাহন ছিলো নৌকা। দুইপাড়ের মানুষের অর্থনৈতিক জীবন মান উন্নয়ন এবং যোগাযোগের দুর্ভোগ কমাতে সরকারের অর্থবছরের একটা বিশাল বাজেট দিয়ে গাজীপুর বাজারের গুদাড়াঘাট এলাকায় সংযোগ সেতু নির্মিত হয়। সেতুর দুপাশে তৈরী হয় সুন্দর সরু রাস্তা। রাস্তার দুপাশে চর আর বর্ষায় থৈথৈ জলরাশি সেখানকার সৌন্দর্য দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। দুপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা খোলা থাকায় সবসময় থাকে বাতাসের খেলা। কিশোরগঞ্জের ‘নিকলী হাওর’র সৌন্দর্যের সাথে তুলনা করে স্থানীয় মানুষজন নাম দিয়েছে ‘গাজীপুর-ধানুয়া হাওর’।

ফরিদগঞ্জে পর্যাপ্ত বিনোদন কেন্দ্রের অভাব থাকায় উপজেলার সকল জায়গার মানুষ বিকেলে ভীড় জমায় সেখানে। আস্তে আস্তে উপজেলা ছাড়িয়ে চাঁদপুর জেলা, পার্শ্ববর্তী কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর জেলার সকল স্থান থেকেই সিএনজি, মোটরসাইকেল যোগে ভ্রমন পিপাসু বিভিন্ন বয়সী মানুষ প্রতিদিন জমায়েত করে। জনাকীর্ণ পরিবেশে মানুষের অসচেতনতায় নষ্ট হচ্ছে ডাকাতিয়া নদী এবং পার্শ্ববর্তী চর। মানুষের উপস্থিতি বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা ফাস্টফুড, ফুচকা, কোমল পানীয়, চা-বিড়ির দোকান খুলে বসেছে।

ঘুরতে আসা মানুষজন পানি পান করে প্লাস্টিকের খালি বোতল, চিপসের খালি প্যাকেট, সিগারেটের খালি প্যাকেট নিক্ষেপ করছে পানিতে। সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চরের পাড়ে গড়ে উঠা ভাসমান ফুচকাওয়ালার সারাদিনের পরিত্যক্ত ময়লা কাগজসহ সকল প্লাস্টিক বর্জ্যর স্তুপ হয়ে ভাসছে পানিতে।

শৌচাগারের ব্যবস্থা না থাকায় ঘুরতে আসা মানুষজন চরের পানিতেই প্রাকৃতিক কার্য সম্পন্ন করছে, তাতে করে খুব দ্রুতই স্বচ্ছ পানিগুলো দূষিত হয়ে যাচ্ছে।

ফরিদগঞ্জ উপজেলার শাহী বাজার এলাকার রিকু সারোয়ার এইসকল অনিয়ম দেখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের টাইমলাইনে ক্ষোভ জানিয়ে লিখেন, ‘আমাদের এলাকায় ভালো কোন পর্যটন কেন্দ্র না থাকায় মানুষগুলো বিকেলে বিশুদ্ধ বাতাস নিতে এখানেই আসে। কিন্তু এই অসচেতন মানুষগুলো একটা চিপস খেয়েও প্যাকেটটা পানিতে ছুড়ে ফেলতেছে। চরের এই জমিগুলোতে শুষ্ক মৌসুমে চাষাবাদ করা হয়। এভাবে জমতে থাকলে চরের জমিগুলো দ্রুতই চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে যাবে। তাতে করে স্থানীয় কৃষকগন ভয়াবহ রকমের ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তাই এই প্রাকৃতিক পরিবেশ টিকিয়ে রাখতে স্থানীয় প্রতিনিধিদের দ্রুতই পরিত্যক্ত ময়লাগুলো সংরক্ষণ করার জন্য ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করতে হবে’।

অসচেতনতায় দূষণ হচ্ছে গাজীপুর-ধানুয়া হাওর 1

ঈদুল আজহায় শাহরাস্তি উপজেলা থেকে ঘুরতে এসে গার্মেন্টস ব্যবসায়ী রবিউল আউয়াল জুটন বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গাজীপুর হাওরের সৌন্দর্যের অনেক ছবি, ভিডিও দেখেছি। তাই বন্ধুরা সহ ঘুরতে আসলাম। এখানে এসে মনে হয়েছে এটা হাওর নয়! এটা যেন একটা বাজার! যেখানে বসে একটু বিশুদ্ধ বাতাস নিবো, সেখানে বসে সিগারেটের দূষিত ধোঁয়া নাকে নিতে হয়েছে। দোকানগুলো হাওর এরিয়ার আরেকটু দূরে বসলে আসল প্রকৃতিপ্রেমী মানুষগুলো এখানে এসে কিছুটা সময় উপভোগ করে যেতে পারবে।

পাশের জেলা কুমিল্লা থেকে পরিবারের সাথে ঘুরতে এসেছেন আরমান খান। আলাপচারিতার এক ফাঁকে তিনি জানান, ‘পরিবারের সকলকে নিয়ে নৌকায় উঠলাম। নৌকায় উঠার আগে মাঝি বললো ত্রিশ মিনিটে জনপ্রতি ৫০ টাকায় ঘুরাবে। সময় অতিবাহিত হওয়ার পরে নৌকা মালিক জানালো জনপ্রতি ১০০ টাকা করে দিতে হবে এবং তাই দিতে বাধ্য হয়েছি। আরমান খাঁন জানান, হুট করে চোখে পড়লো চরের পানিতে চাষ করা একটা মাছ প্লাস্টিকের খালি প্যাকেট থেকে বের হওয়ার জন্য চেষ্টা করছে। পুরো চরজুড়ে অসংখ্য খালি প্যাকেট, বোতল ভাসছে। এভাবে এসব অনিয়ম চললে প্রকৃতি তার আসল সৌন্দর্য খুব শীঘ্রই হারাবে! এই অনিয়মগুলো দেখার কি কেউ নেই?’

আরও পড়ুন-