বর্ষার পানিতে ডুবে থাকা খালের এক প্রান্তে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে রেলপথের মতো এঁকেবেঁকে গেছে বাঁশের তৈরি দীর্ঘ এক সাঁকো। স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত এই সাঁকোর দৈর্ঘ্য ১০৩৩ ফুট।

প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই ডুবে যায় বেলকুচি উপজেলার যমুনা নদী পরিবেষ্টিত রানিপুরা, মনতলারচর, চর আগুরিয়া, মুলকান্দি, বেলির চর সহ এই অঞ্চলের অন্তত ১০টি গ্রাম। যমুনা নদীর পানিতে সয়লাব হয়ে পড়ায় বন্ধ হয়ে পড়ে এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা। পানিবন্দি মানুষদের তখন যোগাযোগের একমাত্র ভরসা কলাগাছের ভেলা আর গুটিকয়েক নৌকা। স্কুল-কলেজগামী ছাত্র-ছাত্রীদের দুর্ভোগের অন্ত থাকে না। বিষয়টি ভাবিয়ে তোলে করোনার কারণে বাড়িতে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আনিসুর রহমানকে। তার এই ভাবনাকে সমর্থন জানিয়ে এগিয়ে আসে গ্রামের উদ্যমী যুবক নূর আলম শেখ, বাবুরাজ, শহিদুল ইসলাম, আব্দুল লতিফ ও আব্দুল শেখ। তাদের এই উদ্যোগের সাথে সহমত পুরো গ্রামবাসী।

সাঁকো নির্মাণের সাথে জড়িতদের দাবি, বাঁশের তৈরি এই সাঁকোটি জেলার গণ্ডি পেরিয়ে দেশের যেকোনো বাঁশের তৈরি সাঁকোর চাইতে দীর্ঘ। তাদের মতে, বেলকুচি উপজেলার প্রত্যন্ত রানিপুরা গ্রামের এই বাঁশের তৈরি সাঁকোর দৈর্ঘ্য হতে পারে দেশের মধ্যে সর্ববৃহৎ।

গ্রামবাসীর মতামত নিয়ে এপ্রিল মাসের শুরুতেই কাজ শুরু করা হয়। ছিন্নমূল আর অভাবি চরাঞ্চলের এই গ্রামগুলো থেকে বেছে বেছে চিহ্নিত করা হয় অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল পরিবারগুলোকে। ৭০টি পরিবারের কাছ থেকে নেওয়া হয় ৩০০ টাকা করে চাঁদা। স্থানীয় একজন ইউপি সদস্য ২ হাজার টাকা দিয়ে সহায়তা করেন। বাকি টাকা আর দীর্ঘ পরিশ্রম করেছেন উদ্যমী এই ৬ যুবক আর গ্রামবাসী মিলে। রানিপুরা গ্রামের সন্তান ঢাকা ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আনিসুর রহমান জানান, অভাব আর প্রকৃতির সাথে লড়াই করেই তিনি বড় হয়েছেন।

চরাঞ্চলের শ্রমজীবী অভাবি মানুষ আর স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের বর্ষা-সময়ের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করেই তিনি এমন উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি জানান. গ্রামবাসী সহায়তা না করলে দীর্ঘ এই সাঁকোটি নির্মাণ করা সম্ভব হতো না। তিনি জানান, সাঁকোটি নির্মাণ করতে বাঁশসহ আনুসাঙ্গিক জিনিসপত্র কিনতে ব্যয় হয়েছে প্রায় সোয়া তিন লাখ টাকা। গ্রামের ৫ যুবক আর গ্রামবাসীরা মিলে দিয়েছেন স্বেচ্ছাশ্রম। তারই ফসল এই দীর্ঘ সাঁকো।

গ্রামের নূর আলম শেখ জানান, একসময় এই অঞ্চলে প্রবাহিত যমুনা নদী ছিল প্রমত্তা। ১৯৮৮ সালের পর যমুনা নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হওয়ায় জেগে ওঠে দীর্ঘ চর। তবে মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত যমুনার শাখা নদী এখনো বয়ে চলেছে। বর্ষা মৌসুমের চার মাস এই অঞ্চল পানিতে ডুবে থাকায় অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষের দুর্ভোগের অন্ত থাকে না। আমাদের মতো দুর্দশাগস্ত গ্রামবাসীদের দুর্দশা লাঘবে আমাদের এই প্রচেষ্টা।

শহিদুল ইসলাম জানান, বন্যার মাঝে আমাদের গ্রামবাসীর সন্তানেরা স্কুল-কলেজে যেতে ভিজে কাপড়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে পাকা রাস্তায় উঠে কাপড় পাল্টিয়ে স্কুল-কলেজে যেত। কিন্তু ইনশাল্লাহ এ বছর আমাদের গ্রামের ছেলে-মেয়েদের এই কষ্ট আর পেতে হবে না।

আব্দুল লতিফ জানান, এই সাঁকোটি নির্মাণের ফলে এই অঞ্চলের অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষ সুবিধা পাচ্ছে। যদিও চরাঞ্চলের এসব গ্রামের অনেক বাড়িতেই পানি প্রবেশ করেছে। তবুও এই সাঁকো দিয়ে চলাচলের কারণে এখন আর তাদেরকে বুক পানি সাঁতরিয়ে পাকা সড়কে উঠতে হচ্ছে না।

গ্রামের গুটিকয়েক মানুষের এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, রানিপুরা গ্রামবাসীর এই উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য একটা মডেল হতে পারে। শুধুমাত্র সরকারের মুখাপেক্ষী না হয়ে গ্রামবাসীর ছোট ছোট সমস্যা যে অনায়াসেই সমাধান করা যায় রানিপুরা গ্রামবাসী সে দৃষ্টান্ত রেখেছে।

আরও পড়ুন-