“তাজউদ্দীন আহমদ আমৃত্যু নীতির প্রতি আপোষহীন ছিলেন, কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নীতি বিচ্যুতি ঘটেছিলো”, “২৫শে মার্চ তাজউদ্দীন সাহেব বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার ঘোষণার কথা বললে বঙ্গবন্ধু তাকে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাতে বলেছিলেন, “বঙ্গবন্ধু ইমোশনাল ছিলেন, দক্ষ নেগোশিয়েটর ছিলেন না এর জন্য পাকিস্তান, ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক কেউই তাকে ভয় পেতেন না, পেতেন তাজউদ্দীনকে“ – এই ধরণের কথা শুধু আপত্তিকরই হয়, ইতিহাস বিকৃতিরও সামিল।

তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা শারমিন আহমেদ ও তার সহকারী মঈদুল হাসানের দুইটি ইতিহাস বিকৃতকারী বই থেকেই এই বিকল্প ইতিহাস পাওয়া যায়। মজার ব্যাপার তাজউদ্দীন আহমদ নিজে কখনো জীবিত থাকতে এরকম কোনো দাবিই করেন নাই। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত।

এই রেফারেন্সগুলোর একটিও যখন কেউ তাজউদ্দীন আহমদকে সম্মান দেখাতে গিয়ে ব্যবহার করে তখন সেও জেনে না জেনে ইতিহাস বিকৃত করে। আর এখানেই আমাদের সমস্যা। যেমন পরশুদিন দেখলাম তাজউদ্দীন আহমদের জন্মবার্ষিকীতে ভুট্টোর সেই কথিত মন্তব্য অহরহ শেয়ার হতে। যেই মানুষটা প্রায় ৩ দশক পাকিস্তানের একের পর এক মিলিটারি রেজিমদের দৌড়ের উপর রাখলেন, ভুট্টো তাকে এতো তাচ্ছিল্য করবে এই কথা তো ভুট্টো নিজের হাতে লিখে গেলেও বিশ্বাস করতাম না। আরেকজন তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে লিখলো ‘স্বাধীন বাংলাদেশের একমাত্র নেতা যিনি আমৃত্যু নীতির প্রতি আপোষহীন ছিলেন’ – তার মানে কি বঙ্গবন্ধু বিকে গিয়েছিলেন ব্যক্তি বা অন্য স্বার্থে? কোনো দরকার আছে অতি ইমোশনাল হয়ে এই রকম মন্তব্যের? যাই হোক, প্রতিবাদ করলাম। পরিষ্কারভাবেই বললাম তাজউদ্দীন আহমদকে সম্মান দেখাতে জাতির পিতার লেগেসিকে খাটো করার তো কোনো দরকার নেই।

কারণ বাঙালিদের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর একচ্ছত্র আধিপত্য কমাতে তার লিডারশিপ স্কিল নিয়ে একটি নয়, কয়েকটি স্বার্থানেষী মহল স্বাধীনতার আগ থেকেই প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর চেষ্টা করছে এবং আজ অব্দি তারা থামেন নাই। ভাসানী, জিয়া, তাহের নামক অনেককেই সেই জায়গায় বসানোর চেষ্টার করা হয়েছে। পঁচাত্তরের বেনেফিসিয়ারিরা বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে যেই প্রোপাগান্ডাটা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে তা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু ভালো প্রশাসক ছিলেন না। দেশ চালাতে ব্যর্থ ছিলেন। কেউ যখন অন্য কাউকে পারদর্শী দেখানোর জন্য বঙ্গবন্ধুর প্রশাসনিক দক্ষতা বা জ্ঞান নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি করে তখন কিন্তু খুনিদের মৃতপ্রায় প্রোপাগান্ডাই নতুন শক্তি পায়।

শাহ আলী ফরহাদ
লেখক- ব্যারিস্টার শাহ আলী ফরহাদ, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী।

তাই লিখলাম যারা এই ধরণের ভুলভাল তথ্য দিয়ে তাজউদ্দীন আহমদের মহত্ব দেখাতে চাচ্ছেন তারা কিন্তু পক্ষান্তরে তাদের পারপাসই সার্ভ করছেন যাদের লক্ষ্য বঙ্গবন্ধু নামক আইডিয়ার শক্তি ক্ষয় করা। কারণ এই পলিটিকাল জায়ান্ট এর আশেপাশেও তাদের নেতারা দাঁড়াতে পারে না। অতিবিপ্লবী বাম, ডান সবারই সমস্যা ওই একজনকে নিয়েই। জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক নামক অপতত্বের জন্ম এই কারণেই। তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় চার নেতার একজন, জাতির পিতার আস্থাভাজন ও ঘনিষ্ট সহচর, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক – তার এই পরিচয়ের জন্যই তাকে বাঙালিদের, বাংলাদেশিদের আজীবন শ্রদ্ধা করতে হবে। সাথে শ্রদ্ধা দেখাতে হবে বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম সহ বাকি তিন জাতীয় নেতাকেও। বঙ্গবন্ধুর খুনি চক্র জানতো এদের একজনও বেঁচে গেলে বঙ্গবন্ধুর দেশনির্মান প্রকল্প অব্যাহত থাকতো। বঙ্গবন্ধুর নীতি অনুযায়ীই দেশ চলতো। তাই চারজনকেই প্রাণ দিতে হলো।

কিন্তু আপনারা কেউ কেউ এই সরল বিষয়টাকে জটিল করে ফেললেন। কয়েকজন সম্মানিত মানুষও যুক্তি তর্কে না এসে শিশুসুলভ চিল্লাচিল্লি করলেন, আজেবাজে ভাষা ব্যবহার করলেন। বঙ্গবন্ধু আর তাজউদ্দীন আহমদ কে নাকি আমি মুখোমুখি দাঁড় করালাম। আমি দাঁড় করালাম নাকি অতিআবেগী যারা এসব অর্ধ সত্য বা মিথ্যা রেফারেন্স দেয় তারা মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে? আমি যেই দোষের প্রতিবাদ করলাম আমাকে সেই দোষেই দোষী করা হচ্ছে?

আবারো বলছি তাজউদ্দীন আহমদকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে হবে। কিন্তু কোনোভাবেই বঙ্গবন্ধুকে খাটো করে নয়। নেতা একজনই হয়। বাংলাদেশের ফাউন্ডিং ফাদার একজনই। বলতে পারেন তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন তার ডান হাত।

ইতিহাস বিকৃতি করে কাউকে সম্মান দেখাতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে খাটো করার অপচেষ্টার প্রতিবাদ আমি করেছি। সেটা যদি অপরাধ হয় আমি অপরাধী। আমার অবস্থানে আমি অনড় থাকলাম।

লিখেছেন- ব্যারিস্টার শাহ আলী ফরহাদ, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী

আরও পড়ুন-