আত্মহত্যা করা নিঃসন্দেহে মহাপাপ। এটা কম বেশি সবাই জানে। তারপরও একটা বাচ্চা কেন এই পথ বেছে নেয়? এটা কিন্তু মোটেও কোন ভিতু মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রচুর সাহসের দরকার।

শুধু একটু ভেবে দেখুন, আপনারা বাবা মায়েরা এবং আত্মীয়স্বজনেরা একটা বাচ্চাকে তার ভবিষ্যৎ এর ভয় দেখিয়ে পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে কি পরিমান মেন্টাল প্রেসার দিলে, সেই বাচ্চার মধ্যে আত্মহত্যা করার মত সাহস চলে আসে! সে তার এই ছোট জীবনের ইতি টানার মত চিন্তা করে! ভেবে দেখুন।

গোল্ডেন পেলে বাচ্চাকে সাইকেল কিনে দিবেন। এটা বলে লোভ দেখিয়ে আপনি হয়তো ভাবেন যে, এতে আপনার বাচ্চা ভালো করে পড়বে। ফলাফল ভালো হবে। কিন্তু এটা কখনোই ভাবেন না যে, সে যদি গোল্ডেন না পায়, তাহলে তার সেলফ কনফিডেন্স কতটা কমে যাবে। সব বাচ্চার জ্ঞান আরোহণ করার একটা নির্দিষ্ট লিমিট থাকে, এর বেশি সে কখনোই নিতে পারে না। তার মধ্যে সেই সাইকেল পাওয়ার লোভ যতটা না কাজ করে, তার চেয়েও বেশি ভয় কাজ করে এটা ভেবে যে, সে যদি কোন কারণে গোল্ডেন না পায়, তাহলে তার বাবা মা ব্যাপারটা কীভাবে নেবে ! এমনিতে আত্মীয়স্বজন খোঁজ খবর না নিলেও, ফলাফল প্রকাশের পরে অবশ্যই কল দিয়ে খোঁজ নিবে, তারা কি ভাববে ! এরপর যখন সেই আশার অনুরুপ ফলাফল আসে না, তখনই ডিপ্রেশনের শুরুটা হয়, আর তার পরের ধাপ হয়তো আত্মহত্যা।

রেজাল্ট একটু খারাপ হলেই বলাবলি শুরু করেন, তোকে কত বলেছিলাম পড়তে। আমার কথা শুনলি না। এবার হলো তো? তোকে দিয়ে কিছুই হবে না। এত কষ্ট করে তোকে পড়ালাম! কি লাভ হল? সব আমার কপাল! পাশের বাসার মেয়েকে দেখ! রাত দিন পড়ে, এখন ঠিকই তার ফল পেয়েছে।

আপনারা দয়া করে, আপনার আশে পাশের কিংবা বাড়ির ওপরের তলার ভাবীর মেয়ের পরীক্ষায় ভালো করার সংবাদটি আপনার বাচ্চার কানে গুজে দিয়ে তাকে ব্যর্থ সাভ্যস্ত করে, তার জীবনটা ধ্বংস করে দিয়েন না প্লীজ। পরীক্ষায় ভালো করতে না পারলেই সন্তান খারাপ বা কম মেধাবী হয়ে যায় না। একজন মানুষ পরীক্ষায় খারাপ করলেই তার জীবন ধ্বংস হয়ে যায় না। ইতিহাসে বহু গুণীজন পরীক্ষায় খারাপ করেও বড় হয়েছেন। তা ছাড়া একটি-দুটি পরীক্ষায় খারাপ করলেই যে জীবন বিনাশ হয়ে যাবে, সেটা ভুল ধারণা। পৃথিবীর অসংখ্য ছেলেমেয়ে পরীক্ষায় খারাপ করে। তারা আবার ঘুরে দাঁড়ায়। শিক্ষাজীবনে ঘুরে দাঁড়ানোর এই চিত্র খুবই সাধারণ। আমার শিক্ষাজীবনে বহু চড়াই-উতরাই গেছে। উত্থান-পতন গেছে। কখনো খারাপ করেছি, কখনো ভালো করেছি। কিন্তু থেমে থাকিনি কখনো। আমার অনেক বন্ধু, যারা আমার চেয়ে অনেক ভালো করেছে একসময়, তাদের অনেকেই ঝরে গেছেন। আমার চেয়ে খারাপ ফলাফল করে অনেক বন্ধু বহুদূর এগিয়ে গেছেন। আমার দুই বন্ধু ক্লাস ফাইভে এবং এইটে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিলেন। পড়ার টেবিলে বসলেই, মা তাদের উদাহরণ টানতেন। অথচ কী দুর্ভাগ্য যে, তাদের একজন এইচ.এস.সি তে গিয়ে তৃতীয় বারে পাশ করেছে। অন্যজন এখনও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করতে পারে নি।

অভিভাবকদের বলছি, ছেলেমেয়েদের ওপর প্রত্যাশার চাপ না দিয়ে তাদের সম্ভাবনাকে বের করার চেষ্টা করুন। সন্তানের পাশে থাকুন। কেউ হয়তো স্কুল-কলেজের গতানুগতিক পরীক্ষায় ভালো করে না কিন্তু সে ভালো গান করে, ছবি আঁকে। লেখালেখিতে ভালো। কেউ হয়তো আজ পরীক্ষায় খারাপ করেছে কিন্তু দুই বছর পর অনেক ভালো খেলাধুলা করে হঠাৎ করেই একদিন সাফল্য অর্জন করবে। এটাই স্বাভাবিক। প্রকৃতি আমাদেরকে এভাবেই গড়েছে। তাই আপনার সন্তানের পাশে থাকুন, সাথেই থাকুন। যাতে সে এই ফলাফলের কমতিকে জীবনের শ্রেষ্ঠ ব্যর্থতা মনে করে কোন ভুল পদক্ষেপ না নেয়। সে যাতে এই ব্যর্থতাকে পুঁজি করে, সামনের সুন্দর জীবন গড়তে পারে।

কখনও আপনার বাচ্চাকে বলে দেখিয়েন, তোকে গোল্ডেন পাওয়ার জন্য চাপ নিতে হবে না। তুই পাশ করেলই তোকে ঐ সাইকেল টা কিনে দিবো। তারপর দেখবেন, হেসে খেলে আপনার বাচ্চা বহুদূর এগিয়ে যাবে। আপনার পাশের বাসার কিংবা ওপরের তলার ভাবীর বাচ্চার সাথে নিজের বাচ্চাকে কম্পেয়ার না করে, তাকে নিজের মত করে বাড়তে দিন। কারণ, আপনার বাচ্চার কিছু হয়ে গেলে, সেই ভাবীর সত্যিই কিছু আসবে যাবে না।

এবার কোয়ারেন্টাইনের একটা ভালো দিক বলি, পরিবারের সবাই যেহেতু বাসায় আছে, তাই এইবার হয়তো টিভি নিউজে কিংবা ফেবুতে এস.এস.সি. পরীক্ষায় গোল্ডেন না পাওয়া কিংবা ফেল করা কোন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর পাওয়া যাবে না।

লিখেছেন- আবির মাহমুদ। প্রভাষক, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ, বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়।