উপকূল এলাকা না হলেও প্রলয় সাইক্লোন আম্পানে যশোর জেলায় ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে জেলার কৃষি-মৎস্য সেক্টর। হাজার হাজার কাঁচা বাড়ি-ঘর ও গাছপালা মাটির সাথে মিশে গেছে। দেড়শ’ কিলোমিটার গতির সুপার সাইক্লোন বয়ে যায় এই জেলার ওপর দিয়ে। তাও আবার সারারাতজুড়ে। ফসলের ক্ষতি হয়েছে অপূরণীয়।

সুপার সাইক্লোন ‘আম্পান’ সাগর ছেড়ে স্থলভাগে উঠে আসার পরপরই বুধবার শেষবিকেলে যশোরে শুরু হয় ঝড়োহাওয়া। এরপর সময় যত গড়িয়েছে বাতাসের দাপট ততো বেড়েছে। মধ্যরাত নাগাদ বাতাসের গতি বেড়ে দেড়শ’ কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায়। জীবদ্দশাতে এমন ঝড় দেখেননি এখানকার প্রবীণেরাও।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ধ্বংসলীলা চালানোর পর সুন্দরবন ঘেঁষে সাতক্ষীরা ও যশোর হয়ে ক্রমে উত্তরের দিকে যেতে শুরু করে আম্পান। এর আগে আম্পানের প্রভাবে দুপুর দুইটা নাগাদ যশোরে বৃষ্টি শুরু হয়। সময় যতো বাড়তে থাকে বৃষ্টির সঙ্গে বাতাসের তীব্রতাও বাড়তে থাকে। বুধবার সন্ধ্যা ছয়টা ৪০ মিনিটে বাতাসের গতি বেড়ে ঝড়ে রূপ নেয়। সঙ্গে চলতে থাকে বৃষ্টি।  রাত দশটার দিকে ঝড়ের তীব্রতা বাড়ে অনেকটাই।

যশোর বিমানঘাঁটিতে অবস্থিত আবহাওয়া দপ্তর থেকে জানা যায়, রাত দশটায় যশোরে ঝড়ের গতিবেগ ছিল প্রতি ঘণ্টায় ১০৪ কিলোমিটার। রাত ১২টায় তা বেড়ে ১৩৫ কিলোমিটারে পৌঁছায়। রাত পৌনে দুইটায় নাগাদ বাতাসের গতিবেগ স্তিমিত হতে থাকে; কিন্তু রেশ থেকে যায় বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত।

আবহাওয়া অফিস বলছে, বুধবার বিকেল পাঁচটায় সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে আম্পান। এরপর সাতক্ষীরা, যশোর, খুলনা হয়ে নড়াইল, রাজবাড়ী, সিরাজগঞ্জ পাড়ি দিয়ে জামালপুর হয়ে দুর্বল আম্পান পাড়ি জমায় ভারতভূমে।

গাছ চাপা পড়ে জেলায় এখনো পর্যন্ত ১২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে বৃহস্পতিবার রাত ১০টা  পর্যন্ত ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে যশোর জেলা প্রশাসন।আর অন্যদের মৃত্যুর খবর স্থানীয়ভাবে পাওয়া গেছে।

পুলিশের বিশেষ শাখার হিসেব অনুযায়ী নিহতরা হলেন, মণিরামপুর উপজেলার পারখাজুরা গ্রামের খোকন দাস (৭০), তার স্ত্রী বিজন দাস (৬০), ওয়াজেদ আলী (৫০), তার ছেলে ইসা (১৫) ও আছিয়া বেগম (৭০), শার্শা উপজেলার গোগা গ্রামের ময়না বেগম, সামটা জামতলার মুক্তার আলী (৬৫), মহিপুড়া গ্রামের মিজানুর রহমান (৬০) ও মালোপাড়ার গোপালচন্দ্র বিশ্বাস, চৌগাছার চাঁদপুর গ্রামের ক্ষ্যান্ত বেগম (৪৫), তার মেয়ে রাবেয়া খাতুন (১৩) এবং বাঘারপাড়ার বোধপুর গ্রামের ডলি বেগম (৪৮)। ঘর বা গাছ চাপা পড়ে আহত হয়েছেন বহু মানুষ। ডিস্ট্রিক্ট ইন্টেলিজেন্স অফিসার (ডিআইও-১) এম মসিউর রহমান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। মণিরামপুরে মৃত্যুর তথ্য জেলা প্রশাসনের কাছে নেই।

সাইক্লোনে হতাহতের পাশাপাশি ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, মাত্র কয়েকদিন আগেই বোরো আবাদ ঘরে তুলেছেন কৃষক। যেকারণে ঝড়ে বোরো ধানের তেমন ক্ষতি হয়নি। তবে সবজি, পাট, পান, আম, লিচুসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. আকতারুজ্জামান বলেন, দীর্ঘস্থায়ী ঝড়ের কারণে যশোরে ফসলের ক্ষতি বেশি হয়েছে।তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমরা জেলার ক্ষয়ক্ষতির তথ্য কৃষি মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। ক্ষতি হওয়া ফসলের মধ্যে রয়েছে ১১ হাজার ৭৮৩ হেক্টর জমির পাট, ১১ হাজার ৭৪৮ হেক্টর জমির সবজি; যা মোট আবাদের ৮০ শতাংশ। এছাড়া ৭৫০ হেক্টর জমির পেঁপে, দেড় হাজার হেক্টর জমির কলা, ৬৭৫ হেক্টর জমির মরিচ, এক হাজার ৪৫ হেক্টর জমির মুলা, তিন হাজার ৩৯৫ হেক্টর জমির আম, ৬০০ হেক্টর জমির লিচু এবং এক হাজার হেক্টর জমির পানের বরজ ক্ষতির মুখে পড়েছে। মাঠে থাকা ফসল ও ফলের ৭০ শতাংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান জেলার প্রধান এই কৃষি কর্মকর্তা।

এছাড়া জেলার নিম্নাঞ্চল কেশবপুর-মণিরামপুর-অভয়নগরের ভবদহ এলাকায় পানিতে তলিয়ে গেছে শত শত হেক্টর জমির ফসল। ভেসে গেছে ঘেরের মাছ। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান বলেন, ঝড়ের সঙ্গে ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে যশোরের কেশবপুর, মণিরামপুরের নিম্নাঞ্চলের কিছু ঘের ও পুকুর ভেসে ক্ষতি হয়েছে। তবে অন্যান্য এলাকায় মাছের তেমন ক্ষতি হয়নি।

আম্পানের আঘাতে গাছপালা ভেঙে জেলার অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়ক আটকে যায়। ঐতিহাসিক ‘যশোর রোডের’ (যশোর-বেনাপোল মহাসড়ক) প্রাচীন বেশকিছু গাছ ভেঙে ও উপড়ে রাস্তার ওপর পড়ে। ফলে দুপুর পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কটি বন্ধ ছিল। এছাড়া যশোর-খুলনা মহাসড়ক, যশোর-মাগুরা মহাসড়ক, যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কসহ অধিকাংশ সড়ক ও গ্রাম্য রাস্তার ওপর গাছ ভেঙে পড়ে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসব গাছ সরিয়ে নেওয়ার জন্য কাজ করেন।

এদিকে, ঝড়ে বিদ্যুতের ব্যাপক ক্ষতি হয়। বিদ্যুতের তারের ওপর গাছ ও ডাল ভেঙে পড়ায় গোটা জেলা বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বুধবার সন্ধ্যায়ই। টানা দশ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন থাকার পর কিছু কিছু এলাকায় সংযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো জেলার দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা বিদ্যুৎহীন রয়েছে বলে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন।

জেলা প্রশাসক শফিউল আরিফ বিকেলে জানান, ‘ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত বিবরণ এখনো নিরুপণ করা সম্ভব হয়নি। কাজ চলছে। তবে মানুষ মারা গেছেন। ঘরবাড়ি ও গাছপালা ভেঙে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মাঠে থাকা ফসল নষ্ট হয়েছে।তিনি বলেন, ঝড়ের কারণে যেসব মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ করা হচ্ছে। তালিকা প্রস্তুত শেষে এসব মানুষকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে।

প্রবীণেরা বলছেন, এর আগে ১৯৮৮ সালে যশোরে একবার বড় ধরনের সাইক্লোন আঘাত করেছিল। আর ২০০০ সালে যশোরে একবার বন্যা হয়েছিল; যা ছিল স্মরণকালের মধ্যে প্রথম।