বাজার বাড়ি

হ্যাঁ, একদম শিরোনামের মতোই হচ্ছে। ঘরে বসেই একটা ফোন কলের মাধ্যমে ঔষধ-বাজার কিংবা চাহিদামত পন্যের অর্ডার করলেই তা পৌঁছে যাচ্ছে বাড়িতে। না, এটা কোন অনলাইন কুরিয়ারের সেবা মাধ্যম নয়। করোনার এই দুর্যোগের সময় এমন সেবা দিচ্ছে ‘বাজার বাড়ি’ নামক একটি সেচ্ছাসেবী সংগঠন।

বিশ্বজুড়ে কোভিড-১৯ বা করোনাভাইরাস এক আতংকের নাম। চীনের উহান প্রদেশ থেকে শুরু করে এই ভাইরাস স্পেন, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটিয়েছে। বাংলাদেশেও গত মার্চের শুরুতে এই করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় এর ব্যপক সংক্রমণ ঠেকাতে সবাইকে ঘরে থাকতেই ডাক্তারগণ পরামর্শ দেন। চাঁদপুর জেলা প্রশাসন থেকে পুরো জেলাকে লক-ডাউন ঘোষণা করা হয়। দৈনন্দিন জরুরী বাজার, ঔষধের জন্য মানুষজনকে বাইরে বের হতে হবে। এতে করেও সংক্রমণ বাড়তে থাকবে। দূর্যোগকালীন সময়ে এই জরূরী সেবাগুলো দিয়ে ফরিদগঞ্জ উপজেলার মানুষকে ঘরের বাইরে না যাওয়ার জন্য নিরুৎসাহি করেন সেচ্ছাসেবক রাসেল হাসান সূবর্ণ।

‘করোনা মহামারী, পাশে আছে বাজার বাড়ি’- এই ট্যাগলাইন ধরেই বৈশ্বিক সমস্যা করোনাকে প্রতিরোধে মাঠে নেমে পড়ে ২১ জন তরুন। অনলাইনে, অফলাইনে কয়েকটি জরুরী হটলাইন নম্বর দিয়ে প্রচার করা হয়। স্থাপন করা হয়েছে একটি অস্থায়ী কন্ট্রোল রুম। চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার যেখানে থেকেই উক্ত নম্বরগুলোতে ফোন দিয়ে পণ্যের নাম বলা হবে, সেচ্ছাসেবকরা অনুরোধ গ্রহণ করে তাৎক্ষণিক ভাবেই গ্রাহকের নিকট পণ্য পৌঁছে দিচ্ছেন।

আজ প্রায় ৪১ দিন যাবত দিনের ২৪ ঘন্টাই অব্যাহত আছে ‘বাজার বাড়ি’র এই সেবা। হটলাইনে ফোন কল পাওয়া মাত্রই সেচ্ছাসেবীরা রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে পায়ে হেটে, সাইকেল বা মোটরসাইকেলে বাজার-সদাই পৌঁছে দিচ্ছে উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে। নেই কোন সার্ভিস চার্জ কিংবা বাড়তি মূল্য, শুধুমাত্র পণ্যের সঠিক দামটি নিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবকরা।

‘ঘরের মানুষ ঘরে রবে, ঔষধ-বাজার পৌঁছে যাবে’ 1
এভাবেই স্বেচ্ছাশ্রমের বিনিময়ে বাজার বাড়ির সেবা পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের ঘরে।

এই সেবা প্রাপ্তির ছোট একটি ঘটনা শুনুন, ফরিদগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ৪ কি.মি. দূরে চরপাড়া গ্রাম থেকে ‘বাজার বাড়ি’ নম্বরে ফোন এলো, রাত তখন ১ টা ৩৪ মিনিট। ফোনের ঐপাশ থেকে কান্না জড়িত কন্ঠে ভেসে আসলো একজন মায়ের কন্ঠ- “ছোট বাচ্চার পেটফুলে গেছে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী একটি ফ্ল্যাকল সিরাপ লাগবে।” কিন্তু এতো রাতে ঔষধ কই পাওয়া যাবে? সব ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে অনুরোধ গ্রহন করেই সেচ্ছাসেবক মামুন এবং সাদ্দাম হোসেন বেরিয়ে পড়লো ঔষধের সন্ধানে। ৭-৮ টি বন্ধ ফার্মেসী দোকানে টোকা দিয়েও ভিতর থেকে আওয়াজ না পেয়েও হাল না ছাড়া স্বেচ্ছাসেবকেরা অতঃপর একটি ফার্মেসীর ভিতর থেকে সাড়া পেলেন। সে ঔষধ নিয়ে সেচ্ছাসেবকরা যখন পৌঁছে দেয়, তখন রাত সোয়া দুইটা।

এমন সব কার্যক্রমের জন্য স্থানীয় জনগণ ‘বাজার বাড়ি’র টিমকে দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে জাতির অগ্রদূত হিসেবেই মনে করছেন। সংগঠন এর মুখপাত্র রাসেল হাসান জানান, “প্রতিদিন আমাদের হটলাইনে ৫০ টির উপরে কল আসে। এতো ফোন কল পেয়ে আমরা নিরুপায় না হয়ে আরো বেশি উদ্যমী হই এই ভেবে যে- ফরিদগঞ্জের মানুষ আমাদের উপর আস্থা রেখেছে। মানুষের আস্থা ও ভালোবাসার প্রতিদান হিসেবে বাজার বাড়ি গত ১ মাস ১০ দিনে ১১০১ টি পরিবারকে জরুরী ঔষধ-বাজারের সেবা দিয়েছে।”

দেশের দুর্যোগে যে ‘বাজার বাড়ি’ নিজেদের উজার করে দিয়েছে মানুষের তরে, তাদের প্রতি অবনত মস্তকে শ্রদ্ধা জানাই। মঙ্গল কামনা করি মানুষের জন্য লড়ে যাওয়া সেচ্ছাসেবকদের জন্য।

আরও পড়ুন-