আজকের করোনার পূর্বসুরি প্যানডেমিক হচ্ছে ইনফ্লুয়েঞ্জা। ১৯১৮ সালে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়, তখন পৃথিবীর লোকসংখ্যা ছিল ১৮০ থেকে ১৯০ কোটির মধ্যে। তার মধ্যে ৫০ কোটি লোকই আক্রান্ত হয়েছিল ইনফ্লুয়েঞ্জায়। মারা গিয়েছিল পাঁচ থেকে ১০ কোটি। মানুষের ইতিহাসে অত বড় মহামারী আর হয়নি।

ভারতে তথা কোলকাতায় ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীর বর্ণনা দিয়েছেন অতুল সুর। তাঁর ‘শতাব্দীর প্রতিধ্বনি’ বইতে আছে, ভারতে সেইবার ৮০ লক্ষ লোক ইনফ্লুয়েঞ্জায় মারা গিয়েছিল। কলকাতাতেও এত মারা গিয়েছিল যে, শ্মশানে দাহ করার স্থান সংকুলান হচ্ছিল না। গঙ্গার পাড়ে আধ মাইল জুড়ে মড়ার খাটগুলো রাখা ছিল।

এই মড়কের মধ্যেও কলকাতায় যুদ্ধজয়ের উৎসব করেছিল ইংরেজ সরকারের আমলারা। বিজয়ী মহারানী খুশী হবেন যে!
মহাত্মা অতুল সুর জানাচ্ছেন- শ্যামবাজারের ঘাটে পোড়ানো হয়েছিল সেই আমলের লক্ষ টাকার বিলাতি আতশবাজি। তার রোশনাইয়ে আলোকিত হয়ে উঠেছিল রাতের আকাশ। কোলকাতা শহর এত লাশ কখনো দেখে নাই। এত আতশবাজিও নয়।

জাহাজ ভরে ইউরোপ থেকে আতশবাজি এসেছিল। মাসজুড়ে। কিন্তু ঔষধ আসেনি, চিকিৎসা সরঞ্জামও নয়। শাসকের চরিত্র একই আছে।

ইনফ্লুয়েঞ্জা, প্লেগ কিংবা করোনা; শতাব্দী ঘুরেও দৃশ্যপটের কি নিদারুণ মিল! 1

মানুষের চরিত্র কেমন ছিল? এই ঘটনা শুনতে যাওয়া যাক; আমার প্রিয় আরেকটা বইয়ে – আরেক মহামারী প্লেগের সময়ে। আমাদের অঞ্চলেই। এই ইনফ্লুয়েঞ্জার আগে এসেছিল প্লেগ। ঊনিশ শতকের শেষভাগে প্লেগ নিয়ে এই গল্পটা শুনিয়েছেন প্রেমাংকুর আতর্থী। তাঁর ‘মহাস্থবির জাতক’ বইতে আছে। কলকাতায় প্লেগ মহামারীর সময় প্রেমাংকুর নিতান্ত কিশোর। পরিণত বয়সে তিনি লিখেছেন, বাংলায় প্লেগ রোগ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্পোরেশন থেকে সবাইকে গৃহবন্দীত্ব (আজকের কোয়ারেন্টাইন) নেওয়ার জন্য অনুরোধ করতে লাগল।

কিন্তু শহরবাসী তাতে রাজি হল না। গুজব ছড়াতে লাগল, যারা পাপী কেবল তারাই প্লেগে মরবে। নইলে মাছি আর মড়া ইঁদুর থেকে জীবাণু হয়ে ভদ্রলোক কিভাবে মরবে! আর প্লেগ হবে কেবল ছোটলোকের, ডোম, মেথর ভিস্তিওয়ালাদের। সজ্জন ধর্মভীরু নিরামিষভোজী কারও এই পচা অসুখ হবে না। কিন্তু একদিন প্লেগ যখন ছড়ানো শুরু করলো…

তখন আবার গুজব ছড়ালো- প্লেগের টিকা নেওয়ার ১০ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু নিশ্চিত। কেউ আবার বলল, পেট থেকে এক পয়সা মাপের মাংসখণ্ড তুলে নিয়ে তার মধ্যে প্লেগের জীবাণু পুরে দেয়।যাতে রোগী জীবিত থাকলেও মরে যায়। এটা সাহেবদের ষড়যন্ত্র।

শাসকের প্রতি অবিশ্বাস জন্মালে, অনেক ঠুনকো গুজবেও মানুষ বিশ্বাসের শরণ নেয়। সেই আগেও, এই এখনও।

প্লেগের সময়ই প্রথম সরকারিভাবে কোয়ারান্টাইন করে রাখার কথা আসে। যাতে রোগী অন্য কোথাও রোগ সংক্রমণ করতে না পারে। কিন্তু কোয়ারান্টাইন মানা হচ্ছে না। মানুষ জিনিসপত্র কিনে শহর থেকে গ্রামে ফিরতে লাগলো। জিনিসের দাম বেড়ে গেলো, বিশেষ করে সেই সময়ের যানবাহন- গরুর গাড়ি আর ঠেলাগাড়ির ভাড়া ৫-৬ গুণ হলো। তখন হাওড়া স্টেশনে, স্টিমার ঘাটে কাতারে কাতারে মানুষের ভিড় হল। রেল কোম্পানি বাড়তি ট্রেন চালিয়েও অতিরিক্ত যাত্রীদের চাপ সামলাতে পারছিল না।

এদিকে মানুষ গ্রামে গিয়ে মরছে। এক মাস এই মহামারীর জ্বালায়, অবরুদ্ধ থেকে – খাবার না পেয়ে শহরের নিম্নবিত্ত মানুষ ঝাড়ু মিছিল করলো। ডাক্তার কুক ছিলেন কোলকাতার প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হলো। মিছিল করে মানুষ সরকারি ধারা অমান্য করলো। রোগী কমাতে বাধ্য হয়ে সরকারকে একটি আইন করতে হলো।

কিন্তু আইনে বাংলার ছোটলাট স্যার জন উডবার্ন ঘোষণা করলেন, প্লেগ হলে সকলকে এখন থেকে হাসপাতালে কোয়ারান্টাইনে নিয়ে যাওয়া হবে না। বাড়িতে একটা পরিষ্কার ঘরে কোয়ারান্টাইন করে রাখলেই চলবে। তাতে মানুষের ক্ষোভ কিছুদূর প্রশমিত হল। তবে এই কোয়ারান্টাইন না মানলে জেল জরিমানা হবে।

সেই ১৮৯৭ সালের, সোয়া ১০০ বছরের পুরোনো ব্রিটিশ আইন, ‘এপিডেমিক ডিজিস এক্ট’- এর বাছুর আইনকে আজকেও সরকারি লোকজন প্রয়োগ করছেন। আজকের বাংলাদেশে। ভাগ্যের পরিহাস।

সেই আইনই আছে, একটু অন্য রূপে। সেই মহামারীকালও আছে, করোনা রূপে। সেই মহারাণীও আছে, একটু ভিন্ন রূপে। সেই আমলাতান্ত্রিক তেলবাজতন্ত্রও আছে, একটু ভিন্নরূপে। সেই ঝুঁকি নেয়া ডাক্তার কুক, সিস্টার নিবেদিতারাও আছেন একটু ভিন্ন দেহে। সেই বোকাসোকা ধর্মগাধারাও আছে, অন্য মেজরিটি হয়ে।

সেই মানুষ মরা লাশও কি থাকবে? মানে লাখ লাখ লাশ! কেবল এইটুকু না থাকুক। এইটুকুই প্রার্থনা।

আর আপনারা যারা লিখতে জানেন। আপনাদের লেখা থাকুক। প্রেমাংকুরের সেই ‘মহাস্থবির জাতক’ বইয়ের মতোন। অতুল সুরের শতাব্দী পেরিয়ে তার প্রতিধ্বনি লেখার মতোন। সময়কে ধরে রাখেন। সময়ের শত্রু-মিত্রকে। পৃথিবীর অসুখে আমরা মরে গেলে। অনাগত প্রজন্ম জানবে। সবকিছু, সব ইয়াদ রাখা হউক।

লিখেছেন- হাসনাত কালাম সুহান