২০০৪ কিংবা ২০০৫ সালের দিকের কথা। জামাত-বিএনপি’র রামরাজত্বে তখন সমালোচিত পুলিশ অফিসার কোহিনুর মিয়ার শাসনামল চলছে উত্তর ঢাকায়। বিশেষ করে কাওরানবাজার, গ্রীনরোড, পান্থপথ, কলাবাগান, শুক্রাবাদ এসব অঞ্চলে মারমুখী থাকতো পুলিশ। প্রায়ই রাস্তায় দেখতাম জ্যামে আটকা পড়ে আছে প্রিজন ভ্যান। ভিতর থেকে শ্লোগান চলছে ‘জয় বাংলা’-‘জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে। এমন একবার পান্থপথ মোড়ে দীর্ঘ যানজটে প্রিজন ভ্যান আটকে আছে। যথারীতি ভিতরে শ্লোগান চলছে। মুহুর্তে প্রিজন ভ্যানের বাইরেও হাজার জনতা। মুহুমুহু শ্লোগান চলছে।

ঠিক এমনি এক সময়ে বাপ্পী আপা’র সাথে প্রথম দেখা। দেখা বলা ঠিক হবেনা। তাঁর সাথে সেদিন কোনো কথা হয়নি। ব্লু জিন্স, সাদা টি শার্ট, সাদা কেডস পরা বাপ্পী আপা। যুব মহিলা লীগ সেদিন খুব আলোচিত কাজ করেছিলো। খুব সম্ভবতঃ সেদিন সারা ঢাকায় জামাত-বিএনপি’র বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিরোধ হয়। সোহেল তাজের আলোচিত ছবিটাও সেদিনের হবার কথা। কাওরানবাজার সার্ক ফোয়ারা মোড়ে কোহিনুর মিয়ার পুলিশের গাড়ির নীচে চাপা পড়ে একজন শহীদ হন।

এভাবেই বাপ্পি আপাকে অনেকবার রাজপথে দেখেছি। এক এগারো চলাকালীন সময়ে প্রথমবার দেখা হয় সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিষ্টার শফিক আহমেদের ইন্দিরা রোডের বাসার সামনে। স্বেচ্ছাসেবক লীগের তৎকালীন সিনিয়র সহ-সভাপতি অধ্যাপক হান্নান ভাইসহ কোনো একটা কাজে ব্যারিষ্টার শফিক আহমেদের বাসা থেকে আমরা বের হচ্ছি তিনি ঢুকছিলেন। কিছুটা সময় দাঁড়িয়ে কথা হলো। তিনি আমার ফোন নাম্বার রাখলেন। আমিও তাঁর নাম্বার রাখলাম।

তারপরে বিভিন্ন সময়ে দেখা হতো। দুই তিনবার দেখা হয়েছে ৩/এ তে। মাঝখানে অনেকদিন দেখা সাক্ষাৎ ছিলোনা। আবার দেখা হলো শাহবাগ শুরু হবার আগে। অনলাইনে যোগাযোগ ছিলো। ফোনেও কথা হতো। দুই হাজার বারো’র শেষদিকে জামাত-শিবিরের তান্ডবে দেশ স্তব্দ।

স্মৃতিতে অম্লান অকালে চলে যাওয়া বাপ্পি... 1
সাবেক সংসদ সদস্য ও অ্যাডভোকেট ফজিলাতুন্নেসা বাপ্পী

২০১৩ তে শাহবাগ! আবার দেখা হলো শাহবাগে। প্রায় সকাল-বিকেলে দেখা হতো, কথা হতো। তাঁর একটা বিষয় ভালো লাগতো, তিনি ছিলেন আপাদমস্তক রাজনৈতিক কর্মী। একবার আমার উপর মনোক্ষুন্ন হয়েছিলেন, আমি সাধারনতঃ আপা’র (মাণনীয় প্রধানমন্ত্রী) নাম ‘শেখ হাসিনা’ লিখতাম বা লিখি। বাপ্পী আপা ফোন দিয়ে বললেন, আপনি আপার নামের আগে ‘মাণনীয়’ লিখেন না কেন? আমি হেসে বল্লামঃ কেউ নিজের আপা’র নামের আগে মাণনীয় লিখে নাকি? আপনাকে কি আমি ‘মাণনীয় বাপ্পি আপা’ লিখবো? তিনি হেসে ফেলে বললেন, আপনারা যারা ব্লগার আপনাদের সাথে কথায় কুলিয়ে উঠিনা, আপনাদের নিয়ে সমস্যা, বেশী বুঝেন!

এইতো গতবছর না তার আগের বছর (তিনি তখন সাংসদ) অসুস্থ হয়ে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি হলেন। কল দিয়ে বল্লেন, ‘আমি তো হাস্পাতালে, একটু দেখে যাইয়েন’। আমি গিয়ে এক সন্ধা হাস্পাতালে আড্ডা দিয়ে আসলাম। হাসপাতালেও তাঁর আতিথেয়তা ছিলো চোখে পড়ার মতো। এমপি-নেতারা অসুস্থ হলেও শান্তি নেই। কতো মানুষ দেখতে আসছে। আমি কয়েকবার উঠে যেতে চাইলেও বসিয়ে রেখেছিলেন!

এবার আর ফোন দিয়ে অসুস্থতার কথা বলেন নাই। আমিও জীবন-জীবিকা নিয়ে ব্যস্ত। ফেসবুকেই ফলো করছিলাম। দেখতে যাওয়া হয়নি! আর দেখা হয়তো হবেওনা। ভালো থাকবেন এডভোকেট ফজিলাতুন্নেসা বাপ্পী।

আরেকটু লিখে তারপরে শেষ করি। একবার হবিগঞ্জ যাওয়ার পথে হোটেল ‘উজান ভাটি’তে দেখা। তাঁর সাথে অনেক লোক লস্কর। ক্ষমতাসীন দলের এমপি হলে যা হয় আর কি! বল্লেনঃ যান কই? বল্লামঃ হবিগঞ্জ। অফিসের কাজে? চলেন আমার সাথে ব্রাহ্মনবাড়িয়া চলেন। বিশাল মিটিং আছে। স্থানীয় একজনকে আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ইনি লেখালেখি করেন, দুঃসময়ে অনেক কাজ করেন, এখন নিজের কাজ করছেন’। আমি লজ্জা পেয়ে গেছিলাম। সেদিন আর তাঁর সাথে যাওয়া হয়নি।

আজকে তিনি নেই। হায়রে টুকরা-টাকরা জীবন! শুধুই ধুলোবালির ওড়াওড়ি। যেখানে থাকুন ভালো থাকবেন আপাদমস্তক রাজনৈতিক কর্মী ও নেতা ‘এডভোকেট ফজিলাতুননেসা বাপ্পি এমপি’। শোক প্রকাশ করছি।

লিখেছেন- অনিমেষ রহমান